ইন্দোনেশিয়া: আবু বাকার বা’আসিরের মুক্তি কি দেশটিতে উগ্রপন্থাকে আবার উস্কে দেবে?

ইন্দোনেশিয়ায় বালি দ্বীপে ২০০২ সালের বোমা হামলার সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত একজন উগ্রপন্থী মুসলিম ধর্মীয় নেতা আবু বকর বা’আসিরকে মুক্তি দেয়ার পর – চরমপন্থীদের ওপর তার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার আল-কায়েদা অনুপ্রাণিত সংগঠন জেমা ইসলামিয়া’র সাবেক প্রধান হচ্ছেন ৮২ বছর বয়স্ক মি. বা’আসির।

জনপ্রিয় পর্যটন দ্বীপ বালির বার ও নাইটক্লাবে ২০০২ সালের ১২ই অক্টোবর চালানো দুটি বোমা হামলার পেছনে ছিল এই জেমা ইসলামিয়া – যাতে ২১টি দেশের ২০২ জন লোক নিহত হয়। ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা।

শুক্রবার সকালে জাকার্তার বাইরের একটি কারাগার থেকে মুক্তির পর মি. বা’আসিরকে বাড়িতে নিয়ে যায় তার পরিবারের লোকেরা।

কর্তৃপক্ষ বলছে, ”উগ্রপন্থী মতবাদ থেকে সরিয়ে আনার একটি কর্মসূচিতে” যোগ দেবেন তিনি।

আবু বাকার বাসিরকে জেল থেকে মুক্তির পর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে
ছবির ক্যাপশান,আবু বাকার বা’আসিরকে জেল থেকে মুক্তির পর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

আবু বাকার বা’আসিরের মুক্তির খবর ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ওই আক্রমণে নিহতদের বেশির ভাগই ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেছেন, নিহতদের পরিবারগুলোকে মর্মাহত করবে মি. বা’আসিরের মুক্তির এই খবর।

কেন তিনি মুক্তি পেলেন?

মি. বা’আসির ছিলেন এমন একজন ধর্মীয় নেতা যিনি অগ্নিস্রাবী বক্তৃতা দিতে পারতেন।

তিনি কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন এমন এক মামলায় যার সাথে বালি বোমা-হামলার কোন সম্পর্ক নেই।

বালিতে ২০০২ সালে বোমা হামলা ধ্বংসপ্রাপ্ত বার ও নাইটক্লাব
ছবির ক্যাপশান,বালিতে ২০০২ সালে বোমা হামলায় ধ্বংসপ্রাপ্ত বার ও নাইটক্লাব

ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে জঙ্গীদের প্রশিক্ষণে সমর্থন দেবার জন্য ২০১১ সালে তাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। তবে পরে ওই সাজার মেয়াদ কমিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেই হ্রাসকৃত সাজা পুরো ভোগ করার পরই তিনি ছাড়া পেয়েছেন।

বালি বোমা হামলার ষড়যন্ত্রের জন্যও মি. বা’আসিরের কারাদণ্ড হয়েছিল – কিন্তু আপিলের সময় সে অভিযোগ খারিজ হয়ে যায়।

মি. বা’আসির সব সময়েই সন্ত্রাসের সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছিলেন।

কীভাবে তাকে বালি বোমা হামলার সাথে জড়িত করা হয়েছিল?

বালি বোমা হামলার সময় জেমা ইসলামিয়া (জেআই) নামের জঙ্গী সংগঠনের কম্যাণ্ডার ছিলেন আবু বাকার বা’আসির।

অনেকে তাকে বর্ণনা করেছেন বোমা হামলার ‘মাস্টারমাইণ্ড’ হিসেবে, কিন্তু তার প্রকৃত ভূমিকা এখনো অস্পষ্ট রয়ে গেছে।

আবু বাকার বা'আসির
ছবির ক্যাপশান,আবু বাকার বা’আসির

জাকার্তার পলিসি ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্টস-এর পরিচালক সিডনি জোন্স বলেন, ওই হামলার কার্যক্রমের প্রধান ছিলেন অন্য কেউ, কিন্তু তাদের কার্যত সবুজ সংকেত হয়তো দিয়েছিলেন মি. বা’আসির। তিনি এর পরিকল্পনা করেননি, কিন্তু তিনি এতে ‘না’ বললে ব্যাপারটা থামানো যেতো।

আবু বাকার বা’আসির অবশ্য পরে জেমা ইসলামিয়া ছেড়ে দেন, এবং তিনি ‘জামা আনসরুত তওহীদ’ নামে আরেকটি চরমপন্থী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

মি. বা’আসির ২১০৪ সালে জেলের ভেতর থেকেই ইসলামিক স্টেটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন বলে খবরে বলা হয়েছিল।

২০০৮ সালে ওই আক্রমণে সংশ্লিষ্টতার জন্য তিন জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এ ছাড়া বেশ কয়েকজনের কারাদণ্ড হয়েছে, অন্য কয়েকজন নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে।

তার মুক্তিতে কি প্রতিক্রিয়া হয়েছে?

বালি বোমা হামলায় বাবা-কে হারানো গারিল আরনান্দা বিবিসিকে বলেন, “আমি এ মুক্তি সমর্থন করি না । আবু বাকার বা’আসির এখনো বিপজ্জনক লোক। সে ইন্দোনেশিয়ায় সন্ত্রাসবাদকে আবার জাগিয়ে তুলতে পারে।”

বোমা হামলায় অস্ট্রেলিয়ার সিডনির কুগি ডলফিন ক্লাবের ৬ জন সদস্য নিহত হয়েছিলেন।
ছবির ক্যাপশান,বোমা হামলায় অস্ট্রেলিয়ার সিডনির কুগি ডলফিন ক্লাবের ৬ জন সদস্য নিহত হয়েছিলেন।

তবে তার মা এন্দেং বলেন, তিনি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং সাজা ভোগ করে ছাড়া পাবার পর তিনি সুপথে ফিরে আসবেন বলেই তিনি আশা করেন।

ওই বোমা হামলায় অস্ট্রেলিয়ার সিডনির কুগি ডলফিন ক্লাবের ৬ জন সদস্য নিহত হয়েছিলেন।

সেই ক্লাবের মুখপাত্র বলছেন, আবু বাকার বা’আসিরের মুক্তিতে তারা হতাশ হয়েছেন।

উগ্রপন্থীদের কাজের পদ্ধতি বদলে গেছে

তবে ড. জোন্স বলছেন, তিনি মনে করেন যে আবু বাকার বা’আসিরের মুক্তিতে ইন্দোনেশিয়ায় সহিংসতার ঝুঁকির ওপর কোন বড় প্রভাব পড়বে না।

তিনি বলেন, তার প্রভাব কমে গেছে, এবং ইন্দোনেশিয়ার রক্ষণশীল মুসলিম গ্রুপগুলো তাকে একজন প্রবীণ ব্যক্তিত্ব হিসেবেই দেখবে। তারা ইন্দোনেশিয়ায় সাধারণভাবে ইসলামি আইন চায়, কিন্তু আবু বাকার বা’আসির নতুন করে সহিংস উগ্রপন্থা অনুপ্রাণিত করতে পারবেন বলে তার মনে হয় না।

“উগ্রপন্থীতের কাজের পন্থাও এখন বদলে গেছে। অনুপ্রেরণা বা নির্দেশনা এখন আসছে ইন্টারনেট থেকে। একক কোন নেতার সংগঠন নয়, বরং এখন ক্ষুদ্র স্বনির্ভর সেলেরই বেশি বিকাশ হচ্ছে” – বলেন তিনি।

বালির আক্রমণের পর ইন্দোনেশিয়া – অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় একটি এলিট সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনী গঠন করে এবং তারা জেমা ইসলামিয়াকে দুর্বল করে দেয়।

এই রকম আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *